মঙ্গলবার , অক্টোবর ১৫ ২০১৯
Breaking News
Home / আন্তর্জাতিক / গ্রিসে আন্তর্জাতিক দালাল চক্রের প্রধান বাংলাদেশী মিজান গ্রেফতার

গ্রিসে আন্তর্জাতিক দালাল চক্রের প্রধান বাংলাদেশী মিজান গ্রেফতার

আন্তর্জাতিক জালিয়াত ও দালাল চক্র ভুয়া প্রতিষ্ঠান গঠন করে দীর্ঘ দিন ধরে গ্রীসের কর কতৃপক্ষকে ধোকা দিয়ে আসছিল। অবশেষে ৬ জন পাকিস্তানী সহযোগিসহ বাংলাদেশী নাগরিক মিজানুর রহমানকে গ্রেফতার করেছে গ্রীক পুলিশ। এই দালাল ও জালিয়াতি চক্র ভুয়া কাগজপত্র প্রদর্শন করে গ্রীসের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মরত লোকদের ধোকা দিয়ে অবৈধভাবে প্রচুর অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে এই দালাল চক্র। ফাকি দেওয়া করের অর্থের পরিমাণ ৭ মিলিয়ন ইউরো এবং তদন্তে আরো ৫ মিলিয়ন ইউরো উর্পাযনের তথ্য গোপন করার প্রমান পাওয়া গেছে। প্রায় ১১ মিলিয়ন ইউরোর মালামাল ক্রয়ের ভুয়া কাগজ ও উদ্ধার করা হয়েছে। 

২০১৩ সালে চিহ্নিত হওয়া এই অপরাধী দালাল চক্র প্রধানত ৩ জন দালাল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসছিল। এইসব দালালরা তাদের নিজ দেশের দাগি আসামী ও অপরাধীদের গলাকাটা পাসপোর্ট দিয়ে প্রচুর অর্থের বিনিময়ে বিদেশে নিয়ে আসতো। দালাল মিজানের উদ্দেশ্য ছিল গ্রীক সরকারকে ধোকা দিয়ে বিপুল অর্থ সম্পদের অধিকারী হওয়া। গলা কাটা পাসপোর্ট দিয়ে সাধারণ প্রবাসী বাংলাদেশীদের কাছ থেকে হাজার হাজার ইউরোও হাতিয়ে নিয়েছে এই দালাল চক্র। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত এই দালাল মিজান পাসপোর্ট বিক্রিতে অন্যতম ছিল। একাধিক নামধারী এই দালাল মিজানকে ঐ সময় বাংলাদেশ দূতাবাসের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সাথে উঠা বসা করতে দেখা যায়। এই দালাল চক্রটি দীর্ঘ দিন ধরে দেশে এবং বিদেশে থাকা অবৈধ অর্থের জোরে বিভিন্ন রাজনৈতিক এবং ব্যাবসায়ী নেতাদের সাথে উঠা বসা করে এবং নেতাদের অর্থ ও উপহার দিয়ে নিজেকে অনেক বড় নেতা হিসেবে হাজির নাজির করে। দালাল মিজান নিজেকে একটি রাজনৈতিক দলের সাধারণ সম্পাদকও দাবি করে একই সাথে নিজ দালালির বৃদ্ধির লক্ষে অবৈধ অভিবাসীদের বৈধ করার আশ্বাস দিয়ে দলে ভিড়াতো। 

২০১৫ সালে গ্রীক পুলিশের বিশেষ অপরাধ দমন ইউনিট এবং গোয়েন্দা বিভাগের বিশেষ টিম ৭ই অক্টোবর মিজানুর রহমানের ফটো স্টুডিওতে যৌথ সাঁড়াষি অভিযান চালিয়ে তাকে হাতে নাতে গ্রেফতার করে। দালাল মিজানের কাছ থেকে ঐ সময়ে ১৮টি বাংলাদেশী পাসপোর্ট ৫টি পাকিস্তানী পাসপোর্ট এবং ইমেগ্রেশন সংক্রান্ত গ্রীক সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিপুল সংখ্যক জাল সার্টিফিকেট ও টাকা উদ্ধার করে পুলিশ। ঐ সময় পুলিশের অভিযান কালে ডজন খানেক পাসপোর্ট কৌশলে সরিয়ে নিয়ে যায় মিজান দালালের লোকজন। পরবর্তীতে ১৬ দিন ডিটেনশন সেন্টারে আটোক থাকার পরে ২৩শে অক্টোবর বৃহস্পতিবার তাকে কঠোর নিরাপত্তায় এথেন্স বিমান বন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে কাতার এয়ার ওয়াইজে তুলে ডির্পোট করে দেওয়া হয়। ঐ সময় এই দালাল মিজানের নাম ছিল মিজানুর রহমান সরদার। আর একটি পাসপোর্টে তার নাম মিজান ব্যাপারী অপর আর একটি পাসপোর্টে তার নাম আছে এম আর মিজানুর রহমান। 

২০১৬ সালে এই মিজান দালাল গলাকাটা পাসপোর্ট দিয়ে গ্রীসে ফিরে এসে নতুন করে আবারো পুরনো দালালি ব্যবসা শুরু করে। এই দালাল মিজানের একটি সহযোগি চক্র আছে। তাদের কাজ সেল ফোন ক্রয় বিক্রয় ও মজুত করে অবৈধ পথে ব্যবহার করা। গ্রীসের সর্বত্র দোকান ভাড়া করে গলাকাটা পাসপোর্ট দিয়ে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ও যন্ত্রাংস দিয়ে সাজিয়ে আমদানি করা পন্য আসল ঠিকানার পারিবর্তে বিভিন্ন স্থানে গ্রহন করে। ইলেক্ট্রনিক লেন দেনের পদ্ধতি ব্যবহার করে স্থানীয় ব্যাংক গুলোর চোখে ধুলো দিয়ে আদান প্রদান করে। চক্রের সদস্যদের ভুয়া কাগজ পত্র সরবরাহ করে। সিসি টিভি, ক্যামরা ও ইন্টারনেট ব্যবহার করে এরা নিজ নিজ লোকদের শর্তক করতো। দালাল মিজান যে সমস্ত ভুয়া কাগজ পত্র দেখিয়ে গ্রীক সরকারকে ধোকা দিয়েছে যেমন পাসপোর্টের ছবি পালটিয়ে বিভিন্ন দেশ থেকে আদম গ্রীসে অবৈধভাবে প্রবেশ করানো। 

গ্রীস ইমেগ্রেশন কর্মকর্তাদের বোকা বানিয়ে রেসিডেন্স পারমিট বের করা এ ক্ষেত্রে তারা কোন কোন সরকারী কর্মকর্তাকে অর্থের লোভ দেখিয়ে কাজ উদ্ধার করতো। এই দালালদের কিছু সাফল্যের মধ্যে যেমন শত শত গলাকাটা পাসপোর্ট বিক্রয় করতে সক্ষম হয়েছে। বিভিন্ন নামে ভুয়া কাগজ পত্র দিয়ে ব্যবসা খুলে বিপুল অর্থ আর্ত্মসাৎ, জাল কাগজ পত্রে বাণিজ্যিক পন্য বিশেষ করে সেল ফোন ইলেক্ট্রোনিক দ্রব্য সর্বরাহ করে প্রচুর অর্থ উপার্যন করেছে। এ সমস্ত ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে বর্তমান সময়ে ৫ মিলিয়ন ৩ লক্ষ্য ১৯ হাজার ঋণ আছে গ্রীক সরকারের কাছে। ১ মিলিয়ন ৭ লক্ষ ২৯ হাজার অন্যান্য ক্ষেত্রে সরানো হয়েছে। একই সময় গ্রীক পুলিশের তদন্তে সর্বমোট ৫ মিলিয়ন ৯ লক্ষ ৫ হাজার ইউরো (ভ্যাট ছাড়া) পরিমাণ অর্থ উপার্যনের তথ্য গোপন করার প্রমান পাওয়া গেছে এবং ভুয়া মালামাল ক্রয়ের ক্ষেত্রে ১১ মিলিয়ন ৩ লক্ষ ৪৭ হাজার ইউরো ফাকি দেওয়া হয়েছে। লক্ষণীয় যে মিজানের ভুয়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গুলো সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য পরিচালিত হতো। কোন একটি প্রতিষ্ঠান সরকারের নজরে এলেই সেটি বন্ধ করে দিয়ে নতুন ঠিকানায় সাথে সাথে আর একটি প্রতিষ্ঠান খোলা হতো।

গ্রীসের কর কর্তৃপক্ষকে ফাকি দেওয়া এবং ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণের স্বার্থে দালালরা বিকল্প ইনভয়েস্ ব্যবহার করতো। গ্রীক প্রশাসনের ধারনা অনুযায়ি ৫৮ মিলিয়ন ইউরো অবৈধ পথে লেন দেন করেছে এই দালাল চক্র। দালাল মিজানের বাসা ও দোকান তলাসি করে অগনিত বাংলাদেশী ও বিদেশি পাসপোর্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলার ভুয়া কাগজ পত্র, দোকান ভাড়া নেওয়ার জাল কাগজ পত্র, গ্রীসের বিভিন্ন ব্যাংকের ক্যাশ কার্ড, ভুয়া প্রতিষ্ঠানের ব্যবহার্য্য সিল, সেল ফোনের  যন্ত্রাংস এবং ডাটা কোর্ড যার মাধ্যেমে ব্যাংকিং লেনদেন চালানো হতো। বিপুল পরিমান ইনভয়েস্, ক্যামরা অন্যান্য যন্ত্রাংশ ও ৯ হাজার ৩৫ ইউরো নগদ পাওয়া গেছে। এই দালাল চক্রটির সাথে আন্তর্জাতিক জঙ্গিদের ও যোগাযোগ থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দালাল মিজানের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে গ্রীসের আদালত থেকে বিশেষ তদন্তকারী সংস্থাকে অধিকতর তদন্তের জন্য নির্দেশ দিয়ে দালাল মিজানকে ১৮ মাসের ডিটেনশন দিয়ে প্রথমে গ্রীসের কেন্দ্রী কারাগার এবং সেখান থেকে  আমফিসা  জেলে হস্তান্তর করা হয়েছে। 

দালাল মিজান গ্রেফতার হওয়ার পরপরই গ্রীসের সনামধন্য গনমাধ্যগুলোতে আন্তর্জাতিক বাংলাদেশী মাফিয়া শিরনামে সংবাদ প্রকাশ করে। অগনিত বাংলাদেশী পাসপোর্ট ও দালাল মিজানের ছবি দিয়ে এই দালাল চক্রের অপকর্ম চিত্র তুলে ধরে গণমাধ্যগুলো। এই অবস্থায় গ্রীসে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশীদের ৩০ বছরের তিল তিল করে গড়ে তুলা সুনাম ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে এই দালাল মিজান চক্র। বাংলাদেশীদের প্রতি গ্রীকদের ভালবাসা এবং বিশ্বাস অবিশ্বাসে চলে এসেছে। এভাবেই প্রবাসের বিভিন্ন দেশে দালাল চক্ররা দেশের ভাবমূর্তিকে ধংশ করে দিয়ে সাধারণ প্রবাসীদের ভাগ্য এবং সুনাম নষ্ট করে দিচ্ছে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশ কমিউনিটির সকল নেতৃবৃন্দের দাবি প্রবাসী বাংলাদেশীদের স্বার্থে এবং জাতীয় স্বার্থে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মননীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রী ও গ্রীসের নিযুক্ত মান্যবর রাষ্ট্রদূত যেন অতি শিঘ্রই এই জগন্য দালাল চক্রকে নির্মুল করে প্রবাসে বাংলাদেশীদের সুনামের সহিত বাসবাস করার সুযোগ করে দেন। 

সূত্র: আমরিতা বাজার

About Mohammad Firoz

Check Also

আগামী ৫-বছরের জন্য প্রবাসী শ্রমিকদের ইকামা ফি কমাতে যাচ্ছে সৌদি সরকার

সৌদি আরব প্রতিনিধি- প্রবাসী শ্রমিকদে শিল্প খাতে কর্মরত প্রবাসী শ্রমিকদের ইকামা ফি কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ব্রেকিং নিউজ