ঈদের খুশি-আনন্দের পরিবর্তে বেঁচে থাকার সংগ্রামটাই এখন মুখ্য প্রবাসীদের

2

মোহাম্মদ ফিরোজ: সৌদি আরব সহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশকিছু দেশে আগামী কাল ২৪ মে, রবিবারে ঈদ উল ফিতর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তবে এইবারে ভিন্ন ধরনের ঈদ উদযাপন করতে যাচ্ছে মুসলিম বিশ্ব। লকডাউন আর কারফিউর মধ্যে জামাত বিহীন ঈদ কেমনে কাটবে প্রবাসীদের দিন। 

ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ এই সরল ও সার্বজনীন কথাটি যেন এবার সমার্থ্য বহন করে না। বৈশ্বিক মহামারী করোণা ভাইরাসে কারণে ঈদের আনন্দটাকে সাদামাটা করে দিল। এই ঈদে নেই কোন কোলাহল, নেই নতুন জামা কাপড় কেনাকাটার ব্যস্ততা। কারফিউ আর লকডাউনের মধ্যেই ঘরে ঈদের নামাজ পড়ে পালিত হচ্ছে পবিত্র একমাস সিয়াম সাধনার পর ঈদুল ফিতর।

বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারী মানব জীবনের স্বাভাবিক গতিধারাকে পাল্টে দিয়েছে! সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, খুশি-আনন্দের পরিবর্তে বেঁচে থাকার সংগ্রামটাই এখন মুখ্য হয়ে উঠেছে।
করোনা মহামারী কেড়ে নিয়েছে মানব মনের সকল খুশি-আনন্দ। প্রতিবছর ঈদ এলে মুসলিম বিশ্ব মেতে উঠে এক অনাবিল স্বর্গীয় আনন্দে আর বিলিয়ে দেয় পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা। প্রবাসীরাও প্রবাসজীবনের শত কষ্ট আর বঞ্চনার মাঝে ঈদের কয়েকটি দিন অন্তত খুঁজে নিত প্রবাসে অবস্থানরত অন্যান্য বন্ধু-বান্ধব কিংবা পরিচিত জনদের সাথে । শেয়ার করতো প্রবাস জীবনের সঞ্চিত ব্যাথা, হালকা করতো নিজেকে।

সৌদিআরবে সহ মধ্যপ্রাচ্যের বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের এইবারে ঈদ ভিন্ন ভাবে পালন করতে যাচ্ছে, প্রত্যেক বছর রমজান মাস আসার সাথে সাথে প্রবাসীদের মনে একধরনের আনন্দ বিরাজ করে কখন টাকা পাঠাবে প্রিয় মানুষগুলো নতুন নতুন জামা কাপড় কেনাকাটা করবে ঈদের জন্য প্রস্তুতি নেবে। প্রবাসীদের ঈদের আনন্দ হচ্ছে পরিবারের সুখ শান্তি। হাজার কষ্টের মাঝেও ঈদের আনন্দ পায় যখন পরিবারের প্রিয় মানুষের মুখে ঈদের আনন্দের হাসি দেখে।

মধ্যপ্রাচ্যের সবচাইতে বড় দেশ সৌদিআরবে প্রায় ২২ লক্ষ বাংলাদেশী অভিবাসী রয়েছে যাদের পাঠানো অর্খ দেশের অর্থনীতির একটি বড় যোগান অথচ এই করোনা মহামারীর কারনে এই প্রবাসীদের অবস্থা বর্তমানে খুবই নাজুক। যদিও মে মাসের শুরু থেকে সীমিত আকারে লকডাউন শিথিল করায় বেশির ভাগ কোম্পানী কাজ শুরু করেছে কিন্তু এরই মধ্যেই ঘটে গেছে অনেক কিছু। চাকরি হারিয়েছে হাজার হাজার প্রবাসী।

একদিকে নিজেরা বেঁচে থাকার সংগ্রাম অন্যদিকে দেশে পরিবার-পরিজনদের ভরণপোষণ, তাদের নিরাপত্তা এসব মিলে প্রবাসী বাংলাদেশীরা মানসিক ভাবে খুবই বিপর্যস্ত। 
মহামারি করোনাভাইরাসে বিশ্বজুড়ে যখন নিরব নিস্তব্ধ,  বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা, দেশে দেশে কারফিউ আর লকডাউন দীর্ঘদিন ধরেই কর্মহীন হয়ে ঘরে বন্দি থাকা প্রবাসীদের এইবারে ঈদ কিভাবে পালন করতে যাচ্ছে তাদের ভাবনার কথা গুলো তুলে ধরার চেষ্টায় কথা বলেছি অনেক প্রবাসী বাংলাদেশির সাথে। অশ্রুসিক্ত নয়নে ভারাক্রান্ত মনে উদাস হয়ে নিজের রুমে বালিশের সাথে শুয়ে শুয়ে পরিবারের কথা চিন্তা করে প্রবাসের মাটিতে পরে আছে নিথর দেহকানি কিন্তু মনটা পড়ে রয়েছে দেশে থাকা প্রিয় মানুষগুলোর কাছে। এমনটাই জানালেন জেদ্দায় বসবাসরত প্রবাসী ইলিয়াস ইলু। তিনি বলেন, গত ২ই মার্চ থেকে শুরু হওয়া করোনা ভাইরাসের কারণে কর্মহীন হয়ে ঘরে বন্দি হয়ে ঘরে পড়ে আছি, অনেক কষ্টে খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছি কিন্তু আমি আমার চিন্তা করছি না আমার পরিবারের কথা চিন্তা করছি আজ কতদিন হলো একটা টাকাও পাঠাতে পারিনি। ছেলে মেয়েদের মুখের দিকে থাকাতে পারছি না। ছোট ছোট অবুঝ শিশু যখন পাশের বাসার বাচ্চাদের নতুন জামা কাপড় দেখে এসে আমাকে বলে বাবা আমারা কবে জামা কাপড় কিনব আমাদের পাশের বাসার ওরা যে নতুন জামা কাপড় কিনে আনল বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ল।


আরেক প্রবাসী সোহেল, জেদ্দার হারেজ মার্কেটে কাজ করতেন তিনি কিন্তু প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের কারণে দীর্ঘদিন ধরে তাদের মার্কেট বন্ধ থাকার কারণে চাকরি হারিয়ে দিনের পর দিন পার করছে অভাবগ্রস্থ পরিবারের কথা চিন্ত করে।

শুধু সোহেল আর ইলিয়াস নয় হাজার হাজার প্রবাসী এখন কর্মহীন হয়ে ঘরে বসে আছে আর আস্তে আস্তে মৃত্যুর দিকে ঝুঁকে পড়ছে। প্রতিনিয়ত হ্নদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে প্রবাসী বাংলাদেশিরা।

সৌদি আরবে এই মহামারী করোনায় বহু সংখ্যক বাংলাদেশী আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আছে এবং প্রতিনিয়ত মৃত্যুর সংবাদ সকল প্রবাসীদেরকে আতংক আর উৎকন্ঠার ঠেলে দিচ্ছে এবং শোকাহত করছে গোটা বাংলাদেশী কমিউনিটিকে। এমতাবস্থায় প্রবাসীদের কাছে এবারের ঈদ যেন জীবনের সবচাইতে সংকটাপন্ন ও বেধনাক্লিষ্ট ঈদ। ঈদের কোন জামায়াত হবেনা, ঈদের পাঁচদিন ছুটিতে চব্বিশ ঘন্টা কারফিউ। সৌদি আরবে প্রায় প্রতিদিনই এখন শুনি প্রবাসী বাংলাদেশীর মৃত্যু সংবাদ সেটা হয়তো করোনায় অথবা হৃদরোগে।

কোন একজন প্রবাসী বাংলাদেশীর মৃত্যুর খবর আসলেই মনে হয় নিজের কোন আপনজন চলে গেছে! প্রবাসের যাতনাময় জীবন, পরিবার-পরিজনদের সুখে রাখার বিরতিহীন সংগ্রাম, অন্ধকারাচ্ছন্ন ভবিষ্যত এসবের কারনে মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসীদের হৃদরোগ বেড়েছে আশংকাজনক ভাবে। তাই প্রবাসীদের এবারের ঈদের সকল খুশি যেন ম্লান হয়ে গেছে এবং পরিবার থেকে দূরে থাকার চাপা কষ্ট আরো বহুগুনে বেড়ে গেছ। তারপরও জীবন থেমে থাকবেনা, চলতে হবে সময়ের হাত ধরে। করোনা সংকটকে জীবন সংগ্রামের একটি অংশ হিসেবে ধরে নিয়ে এই কঠিন অধ্যায়কে অতিক্রম করতে হবে এবং নিজেদের লক্ষে পৌঁছতে হবে। মহান রাব্বুল আলামীনের কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা যেন সমগ্র বিশ্বের মুসলিমদেরকে এই মহামারী থেকে পরিত্র্রাণ দান করেন। বিশ্ববাসী যেন আবার ফিরে পায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। শংকা আর উৎকণ্ঠা কাটিয়ে যেন পৃথিবী আবার প্রাণ ফিরে পায়। প্রবাসীরা যেন ছন্দ ফিরে পায় তাদের এই কঠিন আর নিরস জীবনে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here