১৯৪৬ সালেই জাতীয়তাবাদ ভিত্তিক বাংলাদেশের স্বপ্নচারী

21

নাজমূল হাসান, গবি প্রতিনিধিঃ অধ্যক্ষ আবদুল হামিদ। ব্রিটিশ-ভারতে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে প্রথম এমএসসিতে ফার্স্ট ক্লাস (১৯৩৬ সালে) পাওয়া সত্ত্বেও ভোগবিলাস বিসর্জন দিয়ে সাধারণ মানুষের কল্যাণ ও জীবনমান উন্নয়নে জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। ১৯৩৬ থেকে ’৩৯ সাল পর্যন্ত তিনি কিছুকাল আসাম-বেঙ্গল রেলওয়েতে অডিটর এবং সরকারি কলেজের শিক্ষক ছিলেন। অতঃপর তিনি পরাধীন দেশের মানুষের সার্বিক কল্যাণচিন্তায় রাজনীতিতে যোগ দিয়ে শিক্ষা বিস্তারে মনোনিবেশ করেন। ১৯৪১ সালে তিনি পিতার নামে ‘নারায়ণপুর সরাফত উল্লাহ উচ্চবিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন।

একই সালে তিনি ঢাকার নওয়াব পরিবারের খাজা সেলিমকে পরাজিত করে জেলা বোর্ড, ঢাকার মেম্বার নির্বাচিত হন। ’৪৬-এর নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি বলেন, এই অবাস্তব রাষ্ট্র যদিও বা বাস্তবে রূপ নেয় তাহলেও তা ২৫ বছরের বেশি টিকবে না। তিনি বাংলা ভাষাভাষী এলাকা নিয়ে জাতীয়তাবাদভিত্তিক বাংলাদেশ বা বঙ্গদেশ প্রতিষ্ঠার দাবি তুলেছিলেন। ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত তার ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলাহ কলেজ’ সরকারি অনুমোদন লাভে ব্যর্থ হয়। তার দৃষ্টিতে মুসলিম লীগ ও আওয়ামী লীগসহ তৎকালীন সব রাজনৈতিক দল গণমানুষের সার্বিক কল্যাণে ব্যর্থ বিবেচিত হওয়ায় ১৯৫৮ সালের জুলাই মাসে পাকিস্তান গণমুক্তি পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন, যা মাত্র এক মাসের মাথায় সামরিক শাসনের ফলে অন্য সব দলের সাথে নিষিদ্ধ হয়ে যায়।

’৬২-এর পার্লামেন্টে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ) থাকাকালে তিনি সরকারি চাকরিজীবীদের মতো কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের জন্যও পেনশন তোলেন। স্বতন্ত্র সদস্য হয়েও তিনি পাকিস্তানের যুদ্ধনীতি প্রণয়নে পার্লামেন্টে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের কাছ থেকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের দায়িত্ব নেয়ার প্রস্তাব পেলেও সরকারি দলে যোগদানের শর্ত যুক্ত থাকায় তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। ১২ এপ্রিল, ১৯৬৬ শিবপুরে (রায়পুরা, নরসিংদী) কৃষক সমিতির পঞ্চম বার্ষিক সম্মেলনে, বিরাট দূরত্বে অবস্থিত ও বিদেশী রাষ্ট্র দিয়ে বিচ্ছিন্ন দু’টি ভূখণ্ডের রাষ্ট্র কিভাবে অবাস্তব ও অবৈজ্ঞানিক এবং এরূপ রাষ্ট্রের পরিণতি কী হতে পারে, তা মওলানা ভাসানীর উপস্থিতিতে তুলে ধরেন এবং স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্দোলন শুরু করার আহ্বান জানান।

১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি গণমুক্তি পার্টির পুনর্গঠন উপলক্ষ্যে নারায়ণপুর বাজারে (বর্তমানে বেলাব, নরসিংদী) আয়োজিত বিরাট জনসভায় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের দাবি তুলে ধরেন এবং জনগণ পাকিস্তানে থাকতে চায় কি, এই মর্মে গণভোট আয়োজনের দাবি জানান। রাওয়ালপিন্ডিতে গোলটেবিল আলোচনায় ব্যস্ত শেখ মুজিবুর রহমানসহ নেতাদের বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও গণভোট বিষয়ে আলোচনার জন্য টেলিগ্রাম পাঠান।

১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭০ সালে গণমুক্তি পার্টির কর্মী সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোট দাবির যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। গণভোটের দাবি এবং শ্রমবাদভিত্তিক ( আ: হামিদ কর্তৃক প্রণীত পবিত্র কুরআন, প্রাকৃতিক বিধান ও বিজ্ঞানভিত্তিক শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থার মতবাদ) শ্রমতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবিকে নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোর অন্তর্ভুক্ত করে তিনি গণমুক্তি পার্টিসহ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে অংশ নেন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশেও সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনার কারণে তৎকালীন সরকারের রোষানল থেকে তিনি মুক্ত ছিলেন না।

১৯৭৩ সালে তার প্রতিষ্ঠিত ‘নারায়ণপুর কলেজ’টি পুনরায় সরকারি অনুমোদন লাভে ব্যর্থ হয়। ’৭৫-এর পটপরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমান তাকে প্রধানমন্ত্রিত্ব এবং গণমুক্তি পার্টির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক (পরে সভাপতি) খন্দকার আবদুল হাইকে (যিনি পাকিস্তান মজদুর ফেডারেশন ও বাংলাদেশ মজদুর ফেডারেশনের সভাপতি) মন্ত্রিত্বের প্রস্তাব দিলেও তারা গ্রহণ করেননি। তিনি ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি তার স্ত্রীর নামানুসারে ‘নারায়ণপুর রাবেয়া মহাবিদ্যালয়’ নামে বহু সাধনার কলেজটি পুনরায় চালু করেন। ১৯৮৭ সালে কলেজটির সরকারি অনুমোদন লাভের সংবাদ পাওয়ার পরই তিনি ৬ অক্টোবর ৭৬ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি তার অঢেল পৈতৃক সম্পত্তি এবং সাধনা ও শ্রম উৎসর্গ করেছেন। তার স্বপ্ন বাস্তব রূপ লাভ করলেই তার আত্মা শান্তি পাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here